রংপুর প্রতিনিধি
বর্তমান বিরোধী দল জুলাইয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, সরকারকে ‘করতে দেব না, চলতে দেব না, শেষ করতে দেব না’—এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে বিরোধী দল আবারও আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছে।
রোববার দুপুরে রংপুর শিল্পকলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান লাভ শেয়ার বিডির অর্থায়নে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্পের আওতায় ২৫ জন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে চা-ঘর হস্তান্তর উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিরোধী দলের ভূমিকার সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের একটা বিরোধী দল আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে তারা আবার সেই আগের মতোই ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। শেখ হাসিনা যে ভাষায় কথা বলতেন, এরাও সেই ভাষায় কথা বলছে। করতে দেব না, চলতে দেব না, শেষ করতে দেব না—এইসব বলতে শুরু করেছে।’
তিনি বলেন, সরকারের মেয়াদ এখনো মাত্র চার-পাঁচ মাস। এরই মধ্যে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা শুরু হয়েছে। অথচ এত অল্প সময়ে একটি দেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘টার্ম শেষ করতে দেব না, পারবে না—সরকারের হয়েছে তো মাত্র চার-পাঁচ মাস। এই চার-পাঁচ মাসেই অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলা শুরু হয়েছে। একটা বিপর্যস্ত প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা চলছে। কাজটা এত সহজ না, এত তাড়াতাড়ি হয় না।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তাই সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি নির্বাচনে জিতেছি, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছি। আমি পার্লামেন্ট চালাব, দেশ চালাব—সেই ম্যান্ডেট তো আমি পেয়েছি। আমাকে চালাতে দেন। ব্যর্থ হলে তখন বলবেন। তার আগেই রাস্তায় নেমে এসব কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে।’
বিরোধী দলকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক ভাষায় কথা বলি। গণতন্ত্রকে তার পথে চলতে দিই।’
দেশে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, প্রায় ১৫-১৬ বছরের একদলীয় শাসন, ফ্যাসিজম ও স্বৈরাচারের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন ও দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার পর তিনি দেশে ফিরে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়ে এসেছেন।
তিনি বলেন, দেশে ফেরার দিন তারেক রহমান রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি। বরং দেশকে বদলে দেওয়া এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।
সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষকদের সেচ সুবিধা দিতে খাল খননের কাজও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ইমাম, পুরোহিত ও ফাদারদের সম্মানী এবং দুস্থ খেলোয়াড়দের ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উত্তরাঞ্চলকে কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে চান। এ অঞ্চলে কৃষিকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মধ্যপাড়া ও বড়পুকুরিয়া খনি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে সেখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
রংপুর ও উত্তরাঞ্চলের মানুষ পিছিয়ে থাকার কারণ নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার প্রবণতা কম। অনেকে ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে না।
স্থানীয় জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উদ্যোগ লাগবে, ভবিষ্যৎ চিন্তা লাগবে, সাহস লাগবে। তাহলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
অনুষ্ঠানে সুবিধাবঞ্চিত ২৫ জন মানুষের হাতে চা-ঘরের মালিকানার প্রতীকী কাগজপত্র হস্তান্তর করা হয়। আয়োজকেরা জানান, প্রকল্পটির লক্ষ্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আয় করার সুযোগ তৈরি করা এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা।
লাভ শেয়ার বিডির সভাপতি জাহিদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মুশফিক ফজল আনসারী, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু, জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রেজেকা সুলতানা ফেন্সি, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে। তবে সেই সমালোচনা গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল ভাষায় হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, সরকারকে কাজ করার সুযোগ না দিয়ে আগেভাগেই ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের পর জনগণই সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করবে।![]()