হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় যাত্রীসেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হলে প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিমান চলাচল সেবা প্রতিষ্ঠান মেনজিস এভিয়েশন। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বিনিয়োগের মাধ্যমে সরাসরি প্রায় ১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরোক্ষভাবে আরও সাড়ে ৪ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও তৃতীয় টার্মিনাল ঘিরে নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানান মেনজিস এভিয়েশনের কর্মকর্তারা।
তৃতীয় টার্মিনালের যাত্রীসেবা পরিচালনার চুক্তি পেতে মেনজিসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় রয়েছে আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং ও বিমানবন্দর সেবা খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে চেলেবি এভিয়েশন, ডানাটা, সুইসপোর্ট ও স্যাটস। দ্বিতীয় যাত্রীসেবা অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে তৃতীয় টার্মিনালের সেবায় প্রতিযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মেনজিস এভিয়েশনের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ওয়াইলি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য বিনিয়োগ শুধু বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিমানবন্দর পরিচালনা, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশের স্থানীয় বিমান চলাচল খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের অপারেশনসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন হেন্ডারসনও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পরিচালক সাকিব এরশাদ উপস্থিত ছিলেন।
মেনজিস জানিয়েছে, বাংলাদেশে তাদের অন্যতম বড় উদ্যোগ হবে একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা। ঢাকায় প্রস্তাবিত মেনজিস ট্রেনিং একাডেমিতে আন্তর্জাতিক মানের বিমান চলাচল-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
এভিয়েশন খাতের দক্ষ জনবল তৈরিতে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে মেনজিসের। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে বিমান চলাচল বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম, ইন্টার্নশিপ এবং গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানিটির কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও দক্ষতা স্থানান্তরের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালন, কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানো হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর মাধ্যমে দেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থাকেও সম্ভাব্য বিনিয়োগের আওতায় রাখছে মেনজিস। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনায় বাংলাদেশে নিজেদের কর্মীদের ইউনিফর্ম স্থানীয়ভাবে তৈরি ও সংগ্রহের বিষয়টি রয়েছে। এতে দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে তারা।
মেনজিসের কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় নিয়োগের পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণ, নেতৃত্বের বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান হস্তান্তরকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে বিমানবন্দর পরিচালনা ও গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং সেবায় স্থানীয় জনবলের দক্ষতা বাড়বে।
বাংলাদেশে মেনজিসের সম্ভাব্য কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দ্বিতীয় অপারেটর নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক বা রাজনৈতিক কোনো বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সে প্রশ্নও ওঠে। জবাবে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পরিচালক সাকিব এরশাদ বলেন, প্রতিযোগিতাটি ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে হবে বলে তারা আশাবাদী।
তিনি বলেন, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এটি ভূরাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভিত্তিতেই হবে।’
মেনজিসের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের মাধ্যমে বিমানবন্দর সেবার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। স্থানীয় কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্পৃক্ততার ফলে বিনিয়োগের প্রভাব বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় যাত্রীসেবা অপারেটর নিয়োগ হলে গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং ও যাত্রীসেবায় একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে সেবার মান, দক্ষতা ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দ্বিতীয় অপারেটর হিসেবে কোন প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।![]()